একটি শব্দের ভুল ব্যাখ্যা এবং জাপানের পারমাণবিক কান্না

১৯৪৫ সালের জুলাই মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম দুই অক্ষশক্তি ইতালি ও জার্মানি আত্মসমর্পণ করলেও জাপান এখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। মিত্রবাহিনীর প্রচন্ড বিমান হামলায় গুরুত্বপূর্ণ কারখানা, সামরিক ঘাঁটি, রেলপথ, রাস্তাঘাট, সেতু ইত্যাদি খুব বাজেভাবে ধ্বংস হচ্ছে। কোনোরকমে কাজ চালানোর মতো মেরামত জাপান সরকার করতে পারছিলো না। শহর ও নগর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুহারা।

মার্কিন নৌ অবরোধের মুখে পড়ে দ্বীপরাষ্ট্র খাদ্য সংকট তখন চরম আকার ধারণ করেছে। জাপানের সর্বশেষ নৌবহরটি মিত্রবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরে। কিন্তু যুদ্ধবাজ জাপানি জেনারেলরা তখনও শান্তিবাদীদের তরফ থেকে আত্মসমপর্ণ করার কথা শুনলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠছেন। মিত্রবাহিনীও একগুঁয়ে রণউন্মত্ত জাপানিদের কীভাবে ঠান্ডা করা যায় সেই চেষ্টায় ব্যস্ত। এমন সময় হাতে এলো আলাদিনের চেরাগ! বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা ‘ট্রিনিটি’-এর বিস্ফোরণ জানান দিচ্ছে যে সফল হয়েছে ম্যানহাটন প্রকল্প।

প্রজেক্ট ম্যানহাটন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই পরাশক্তিগুলো হাতে পেতে চাইল এমন এক অস্ত্র, যার ধ্বংস ক্ষমতা হবে প্রচলিত যেকোনো অস্ত্রের চেয়ে বেশি। যুদ্ধে জিততে হলে এমন কিছু দরকার যার নাম শুনলেই যেন শত্রুর অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। জার্মানির নিউক্লিয়ার অস্ত্র বানানোর চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তড়িঘড়ি করে কুখ্যাত ম্যানহ্যাটন প্রজেক্ট শুরু করে। এতে যুক্তরাজ্যের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত পারমাণবিক বোমার মাধ্যমেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছিল। একে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বৈজ্ঞানিক ও শৈল্পিক প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই প্রকল্পের জন্য মোট ১,৭৫,০০০ লোক কাজ করে এবং এতে খরচ হয় তৎকালীন প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী জে. রবার্ট ওপেনহেইমার। প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী ও গণিতবিদদের মধ্যে রয়েছেন ফিলিপ এইচ আবেলসন, হান্স বেটে , সেথ নেডারমেয়ার, জন ফন নিউমান, ইসিদোর ইজাক রাবি, লিও জিলার্দ, এডওয়ার্ড টেলার, স্তানিসল’ উলাম, নিলস বোর, জেমস চ্যাডউইক, এনরিকো ফের্মি, রিচার্ড ফাইনম্যান, অটো ফ্রিশ্চ, জর্জ কিস্তিয়াকোভ্স্কি, আর্নেস্ট লরেন্স, ফিলিপ মরিসন, হ্যারল্ড উরে এবং ভিক্টর ওয়েইজকফ। প্রকল্পে কাজ শুরু করার আগেই তাদের মধ্যে পাঁচজন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং যুদ্ধের পর এখান থেকে আরও তিনজন নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

ম্যানহাটন প্রকল্প ৪টি পারমাণবিক বোমা বানিয়েছিল। এর মধ্যে ট্রিনিটি নামক প্রথম বোমাটি নিউ মেক্সিকোর আলামোগোর্ডোর নিকটে পরীক্ষামূলকভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। অন্য দুটি বোমা, ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’, ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট এবং ৯ আগস্ট তারিখে যথাক্রমে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বিস্ফোরিত হয়। শেষ বোমাটি আগস্টের শেষ দিকে জাপানের রাজধানী টোকিওর উপর নিক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল! কিন্তু তার আগেই জাপান আত্মসমর্পণ করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

১৯৪২ সালে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় এবং ১৯৪৬ সালে একে অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়। এর ফলে মূলত ম্যানহাটন প্রকল্পের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জাপানে কি আদৌ পারমাণবিক বোমা ফেলার দরকার ছিল? ঐতিহাসিক দলিলগুলো কী বলে?

ট্রিনিটি বোমা পরীক্ষার ভয়াবহতা দেখার পর শেষ পর্যন্ত এই অস্ত্রের ব্যবহার হবে কি না, হিরোশিমা- নাগাসাকিতে নিউক্লিয়ার বোমা ফেলা হবে কি না- এরকম একটা দ্বিধা ১৯৪৫ সালের দিকে আমেরিকান প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের মাথায় কাজ করেছিল। তারা যে একটা দোলাচালে ভুগছিলেন ঐতিহাসিক সব গোপনীয় দলিল আর প্রমাণ ঘাটলে তা স্পষ্টতই বোঝা যায়।

এই ব্যাপারে ২০১৫ সালে চালানো একটি জরিপের ফল অনুযায়ী, বেশিরভাগ মার্কিনীসহ বিশ্বের অধিকাংশের মত হচ্ছে- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটা ইতি টানতে হলে জাপানকে আত্মসমর্পণ করতেই হত। সুতরাং তাদের মনোবল ভাঙতে নিউক্লিয়ার বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত সঠিক। কিন্তু যদি আপনি ইতিহাসের দিকে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন, ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন জেনারেল ও মিত্রবাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের মিলিটারি কমান্ডার এবং রাজনীতিবিদগণ এই মতবাদের সঙ্গে একমত পোষণ না করে একটু ভিন্ন ধারায় ভেবেছেন। জাপানের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, সাদাও আসাদা, দ্য প্যাসিফিক হিস্টোরিক্যাল রিভিউ (১৯৯৮)-এ বলেছেন, “জাপানের আসলেই আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেবার জন্য পারমাণবিক বোমার আদলে একটু বাড়তি চাপের দরকার ছিল।

তাহলে কেন পরমাণু বোমা হামলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল? 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর নৌযুদ্ধগুলো হয়েছিল জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে। ১৯৪২ সালের ৪-৭ জুন পর্যন্ত হওয়া ‘ব্যাটল অফ মিডওয়ে‘-কে বলা হয় ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম নৌযুদ্ধ। অপ্রাসঙ্গিক হলেও এই যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা হলো, কারণ এই যুদ্ধেই ১৫ ঘন্টার ব্যবধানে ৪টি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার হারিয়ে ইম্পেরিয়াল জাপানী নেভি একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পরবর্তী নৌযুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সুবিধা পায় এবং ধীরে ধীরে প্যাসিফিক থিয়েটারে যুদ্ধের সমীকরণ নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসে।

এরপর ৮১ দিনের ভয়ংকর যুদ্ধে ওকিনওয়া দ্বীপ জয় করে মিত্রবাহিনী। এবার তারা জাপানের মূল ভূখণ্ডে আক্রমণের জন্য ‘অপারেশন ডাউনফল’-এর প্রস্তুতি শুরু করে। ফলে আগে থেকেই চালু থাকা নৌ-অবরোধ আরও কড়াকড়িভাবে কার্যকর করা হয়। জাপানী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো মিত্রবাহিনীর গ্রেফতার ও হামলার ফলে রসদ নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারতো না। এভাবে তাদের মনোবল ভেঙে দেয়া হয়।

রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ সম্মানজনক আত্মসমর্পণের কথা ভাবলেও রণ-উন্মত্ত জাপানি জেনারেলরা যুদ্ধ করতে করতে মৃত্যুকে বরণ করবেন- এমন নীতিতে অটল ছিল। তারা জনগণকে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন, যুদ্ধের মোড় শিগগিরই ঘুরে যাবে এবং তাদের চূড়ান্ত বিজয় সুনিশ্চিত। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল কোরেচিকা অনামিই এ মর্মে দৃঢ় প্রত্যয় ঘােষণা করলেন, আক্রমণকারীরা অচিরেই ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে বিতাড়িত
হবে।

যুদ্ধবাদীদের এমন আচরণ দেখে স্বল্প সংখ্যক রাজনীতিবিদ নিশ্চিত ধারণা করলেন যে, যুদ্ধে পরাজয় তাদের অবধারিত এবং পরাজিত হলে জাপান সর্বস্ব খোয়াবে, তার চেয়ে আত্মসমর্পণ করলে বরং কিছুটা মর্যাদা রক্ষা করা যাবে। তাছাড়া পরাজয় যখন নিশ্চিত তখন অযথা নিজেদের অবকাঠামো শত্রুর হাতে ধ্বংস হতে দেয়াটাও বোকামি। তাই বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের চেয়ে একটু আগেভাগে কিছু শর্তে কোনো একটা মীমাংসায় পৌঁছানো যায় কি না, সে ব্যপারে মিত্রপক্ষের সঙ্গে আলোচনা জন্য তারা জাপানে অবস্থানরত সােভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে গােপনে যোগাযোগ স্থাপন করেন।

উল্লেখ্য, তখন পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। ১৯৪৫ সালের জুনের শুরুতে জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কোকি হিরোতো সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত জ্যাকব মালিকের সাথে জাপান সরকারের দূত হিসেবে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নিয়ে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু তিনি তেমন একটা উৎসাহ দেখাননি, জাপান যে যুদ্ধে হারতে যাচ্ছে তা জানতেন জ্যাকব। পরে ১২ জুলাই আবারও শান্তির আবেদন সম্বলিত একটি বাণী জাপান সম্রাট হিরোহিতো তার যুবরাজের হাতে দিয়ে তাকে এ মর্মে নির্দেশ দেন যে, সে যেন দেরি না করে নিজে সোভিয়েত ইউনিয়নে যায় এবং সরকারের হাতে বাণীটি পৌঁছে দেয়।

বিশেষ দূত হিসেবে যুবরাজ তখনই বিমানযোগে রাশিয়ায় রওনা হন এবং যথাযথভাবে আবেদনটি স্ট্যালিনের কার্যালয়ে পৌঁছে দেন। ব্যস্ততার মাঝেও জোসেফ স্ট্যালিন তার সাথে সাক্ষাৎ করেন, কিন্তু তিনি কোনো আশ্বাস দেননি। তিনি বলেন, যেহেতু তারা তখন পটসডাম কনফারেন্সের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত, সুতরাং সেই মুহূর্তে তাদের পক্ষে শান্তি স্থাপনের জন্য কিছু করার অবকাশ নেই। আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানিদের এই আবেদনে একেবারেই পাত্তা দেয়নি। তাই তারা সরাসরি হ্যাঁ অথবা না, কোনোটাই বলেনি। এ ব্যাপারে পটসডাম সম্মেলনে কথা প্রসঙ্গে স্টালিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে বলেন “জাপানিরা শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে এসেছে, কিন্তু আমি তাদের পাত্তা দেইনি। কারণ আমি জানি ওদের মধ্যে সরলতা নেই।”

১৯৪৫ সালের ২৭ জুলাই পটসডাম থেকে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কর্তৃক একটি চরমপত্র জাপানের উদ্দেশ্যে রেডিওতে প্রচার করা হয়। রাশিয়া যদিও সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে, কিন্তু তারা তখনও জাপানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে লিপ্ত নয় বলে রাশিয়ার পক্ষ থেকে স্বাক্ষর দেয়া হয়নি। রেডিওতে বিভিন্ন ধরনের হুমকিসহ আত্মসমর্পণ না করলে কী ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হবে তা বলা হয়।

অবিলম্বে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ না করলে তোমাদের নিষ্পেষিত করে দেয়া হবে। আত্মসমর্পণ করলে তোমরা জাপানী জাতি হিসেবে টিকে থাকার অধিকার পাবে। নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো কেমন হবে তা তোমরাই নির্ধারণ করবে এবং সর্বোপরি জাপান সম্রাটের সিংহাসন অক্ষত থাকবে।

এমন ঘোষণা শোনার পর জাপানী নেতাদের মধ্যে নমনীয় ভাব দেখা গেল। কারণ যুদ্ধ বিরতির শর্ত যেমন কঠোর হবে বলে তারা ধারণা করেছিলেন, তেমন কঠোর নয়। সম্রাট তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী তােশাকে নির্বিধায় বললেন, ঘোষণা তার মতে গ্রহণযোগ্য। সম্রাটের অনুমতি পেয়ে মিত্রবাহিনীর চরমপত্র বিবেচনার জন্য অবিলম্বে মন্ত্রিসভার অধিবেশন বসে গেল এবং যুদ্ধমন্ত্রী ও চীফ অফ আর্মি স্টাফের বিরোধিতা সত্ত্বেও আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে গিয়ে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়। প্রথমত, সোভিয়েত ইউনিয়নের মাধ্যমে পাঠানো শান্তি প্রস্তাবের কোনো চূড়ান্ত খবর আসেনি। দ্বিতীয়ত, জাপানীরা মিত্রবাহিনীর চরমপত্র পেয়েছে রেডিও মারফত। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা বার্তা নয়। নিশ্চিত না হয়ে এত বড় পদক্ষেপ নেয়া কি ঠিক হবে?

এদিকে মিত্রবাহিনী আশা করছিলো, উক্ত চরমপত্রের জবাবে জাপানীরা তাদের অবস্থান পরিস্কার করে বক্তব্য দেবে। তারাও জাপানিদের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আশা করেছিল। পরদিন, ২৮ জুলাই, প্রধানমন্ত্রী কানতারো সুজুকি জাপানি সাংবাদিকদের একটি প্রেস কনফারেন্সে জানান, মন্ত্রিসভা এখনও মিত্রবাহিনীর দেয়া চরমপত্র নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। মন্ত্রিসভা ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। অর্থাৎ এই প্রসঙ্গ নিয়ে পরবর্তীতে আরো বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

কথা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ‘মোকুসাৎসু’ (黙殺-mokusatsu) শব্দটি ব্যবহার করেন। জাপানি ভাষায় এই শব্দটি দ্ব্যর্থবোধক, অর্থাৎ এই শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে। প্রথম অর্থের ইংরেজি হচ্ছে ‘ignore with contempt’ বা ‘not pay attention to’ ,যার বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘অবজ্ঞার সাথে উপেক্ষা করা’ বা ‘গুরুত্ব না দেয়া’। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে ‘refrain from any comment’ বা ‘কোনোপ্রকার মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা’। খেয়াল করে দেখবেন, অনেক সময় স্পর্শকাতর ইস্যুতে সরকারি কর্মকর্তাগণ নিজেদের পরিস্কার করে বক্তব্য দেন না। কিন্তু জাপানি প্রধানমন্ত্রীর পুরো বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি আসলে দ্বিতীয় অর্থ বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ মিত্রবাহিনীর আত্মসমর্পণের আহবানে হ্যাঁ বা না, কিছুই বলেননি।

কিন্তু জাপানি বার্তা সংস্থা ডোমেই নিউজ এজেন্সি প্রধানমন্ত্রীর ঐ বক্তব্য ইংরেজি তরজমা করতে গিয়ে প্রথম অর্থকে বেছে নেয়। রেডিও টোকিও প্রচার করে যে মন্ত্রিসভা পটসডাম চরমপত্রকে ‘ইগনোর’ করেছে অর্থাৎ তারা এর প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয়নি, একদমই উপেক্ষা করেছে। ফলে ১৯৪৫ সালের ২৮ জুলাই লন্ডনের টাইমস পত্রিকায় প্রধান শিরোনাম হয় যে ‘টোকিও টু ইগনোর অ্যালাইড টার্মস — ডিটারমিনেশন টু ফাইট অন’। অর্থাৎ জাপানিরা আত্মসমর্পণের শর্তের উপর কোনো প্রকার গুরুত্ব দেয়নি, বরং তারা লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।

বাকি ঘটনা আপনারা জানেন। উক্ত চরমপত্র যে ফাঁকা বুলি ছিল না তা প্রমাণ করার জন্য ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট নিউক্লিয়ার বোমা ফেলা হয় জাপানের হিরোশিমাতে। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সেদিন পারমাণবিক বোমা হামলা সম্পর্কে বলেন,

It is a harnessing of the basic power of the universe, the force from which the sun draws its power has been loosed against those who brought war to the Far East.

প্রথমে মার্কিন প্রশাসনের অনেকেই বোমা ফেলার বিরুদ্ধে ছিলেন, কিন্তু যুদ্ধবাজ জাপানের রণ-উন্মাদ মানসিকতা তাদের দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করেছে। এমনকি দুটো নিউক্লিয়ার বোমা পড়ার পর পরই জাপান সম্রাট যখন অবিলম্বে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন, তখন সম্রাটকে গ্রেফতার ও প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিল এক জাপানি মেজর। এবার বুঝুন তাদের অবস্থা কেমন ছিল।

কিন্তু মন্ত্রিসভা কেন উক্ত শব্দের সঠিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি?

হিরোশিমায় এত ভয়ংকর হামলা হওয়ার পর পরই সেটি করা উচিত ছিল। হয়তো বা আত্মসমর্পণের জন্য নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার করার জন্য সামান্য সময় চাইলে মিত্রবাহিনী সেটি জাপানকে দিত। কিন্তু জাপান সরকার কেন নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করে বক্তব্য দেয়নি? এই উত্তর পেতে হলে তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা জানতে হবে।

আত্মসমর্পণের প্রশ্নে শান্তিবাদীদের সাথে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্ব চলছিল। সেনাবাহিনীর জেনারেলদের নির্দেশে নির্বিচারে শান্তিবাদীদের গ্রেফতার করে জেলে ঢোকাচ্ছিল। এমনও শোনা যায় যে, মন্ত্রিসভার উক্ত মিটিং গোপনে আয়োজন করার চেষ্টা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী সুজুকি, তার উপর সেনা কর্মকর্তাদের ব্যাপক চাপ ছিলো। এজন্য সম্ভবত তিনি ঐরকম দ্ব্যর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করেছিলেন সেনা কর্মকর্তাদের রোষানল থেকে বাঁচতে। উক্ত নিউজ এজেন্সিও নিজেদের গর্দান বাঁচাতে প্রথম অর্থকে বেছে নেয়। কিন্তু জাপানের উচিত ছিল হিরোশিমাতে বোমা পড়ার পর পরই উক্ত শব্দের ব্যাখ্যা প্রচার করা এবং আত্মসমর্পণ করা।

দুটো কাজের একটিও তারা করেনি, এমনকি অফিশিয়ালভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগও করেনি। ফলে ৯ আগস্ট দ্বিতীয় বোমা নাগাসাকিতে ফেলা হয়। এমনকি তৃতীয় বোমাটি রাজধানী টোকিওতে ১২ আগস্ট ফেলার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল! কিন্তু নাগাসাকিতে হামলার পর পরই আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত জানিয়ে মিত্রবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে এবং ব্যর্থ অভ্যুত্থানের কারণে মাঝখানে তিন দিন দেরি করে ১৫ আগস্ট তা ঘোষণা দেয়া হয়। জাপান অফিশিয়ালি আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে সেপ্টেম্বরের ২ তারিখে।

পাঠকদের অনেকেরই মনে হতে পারে- একমাত্র যে নিউক্লিয়ার বোমার কারণে জাপান আত্মসমর্পণ করেছে তা কিন্তু নয়। ৯ আগস্ট দ্বিতীয় বোমা হামলার কয়েক ঘন্টা আগে সেদিন মধ্যরাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আকস্মিকভাবে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং মাঞ্চুরিয়া, কুড়িল আইল্যান্ডসহ বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। একদিকে বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও খাদ্য সংকট, অন্যদিকে হিরোশিমায় নিউক্লিয়ার বোমা হামলার ভয়ংকর ক্ষয়ক্ষতি। মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের আক্রমণ, যা ঠেকানোর শক্তি জাপানের ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই দেশ বাঁচাতে আত্মসমর্পণ করে জাপান।

তাহলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্তের পিছনে ঐ শব্দের ভুল ব্যাখ্যাই একমাত্র দায়ী?

প্রসঙ্গত, এখানে অনেকেই অপারেশন ডাউনফলের কথা বলবেন। দ্বীপরাষ্ট্র জাপানের মূল ভূমিতে হামলা করার জন্য এই অপারেশনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আশেপাশের দ্বীপে যুদ্ধ হলেও তার মূল ভূখণ্ডে কোনো যুদ্ধ হয়নি। শুধুমাত্র বিমান হামলা করেছে মিত্রবাহিনী। অপারেশন আইসবার্গ তথা ৮১ দিনের ভয়ংকর ‘ব্যাটল অফ ওকিনওয়া‘-তে হেরে ইম্পেরিয়াল আর্মির মনোবল তখন তলানিতে চলে গেছে। তাছাড়া প্যাসিফিক থিয়েটারে একের পর এক নৌযুদ্ধে জাপানের পরাজয় এবং নৌ-অবরোধের কবলে পড়ে ঠিকমত সরবরাহ না পাওয়ায় দ্বীপরাষ্ট্র জাপানের জন্য পরিস্থিতি মারাত্মক রকমের খারাপ হয়েছিল।

এরই মধ্যে সুযোগ সন্ধানী সোভিয়েত ইউনিয়ন হঠাৎ আক্রমণ করে জাপানি ভূমি দখল করে নেয়। অপারেশন ডাউনফলের প্রথমাংশ খুশু দ্বীপের জন্য অপারেশন অলিম্পিক নামে আরম্ভ করা হলেও যে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী নেভি, প্রায় ৫ লাখ আর্মির সাথে ব্রিটিশদের প্রায় ১ লাখের সাহায্যে জিততে পারতো না, এমনটা কিন্তু নয়। তবে ওকিনওয়ার যুদ্ধের শিক্ষা হলো- একগুঁয়ে রণ-উন্মাদ জাপানিদের সরবরাহ বন্ধ করে বিপদে ফেলে আত্মসমর্পণ করাতে হবে। অন্যথায় অবশিষ্ট প্রায় ৪৩ লাখ সেনার বিরুদ্ধে লড়াই করে পুরো জাপান দখল করতে হলে প্রচুর রক্ত ঝরাতে হবে। এত ঝামেলা না করে পারমাণবিক বোমা মেরে অবশিষ্ট মনোবল গুঁড়িয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই কাজটি করতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্ররোচিত করে ঐ শব্দের ভুল ব্যাখ্যা!

তারপরও ন্যায্যতার স্বার্থে আরেকটা প্রশ্ন উঠল যে, কেন দুটো বোমা বিস্ফোরণ করা হলো? একটি ফেললে সেটিই কি যথেষ্ট ছিল না? এমনকি তৃতীয় বোমা নিক্ষেপের প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছিল বলে শোনা যায়!

আমেরিকান ইতিহাসবিদ বারটন ব্যারনস্টাইন বলেছেন, প্রথম বোমা নিক্ষেপের কতটুকু প্রয়োজনীয়তা ছিল, তা নিয়ে অনেকেই অনেক রকম ভাবতে পারে, তবে দ্বিতীয় যেটা নাগাসাকিতে ফেলা হলো, তা অত্যাবশ্যকীয়ভাবেই অপ্রয়োজনীয় ছিল। তৎকালীন মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাতজন ফাইভ স্টার জেনারেলের ছয়জনই পারমাণবিক হামলার প্রয়োজনীয়তা ছিল না বলে মত প্রকাশ করেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের সিদ্ধান্তের উপর তাদের কিছু বলার ছিল না। সেই কমান্ডারগণ হলেন জেনারেল ম্যাকআর্থার, জেনারেল ডুইট আইজেনহাওয়ার, জেনারেল হেনরি হ্যাপ আর্নল্ড, অ্যাডমিরাল উইলিয়াম লিহি, অ্যাডমিরাল চেস্টার ডব্লিউ নিমিটজ ও অ্যাডমিরাল আর্নেস্ট কিং।

তাদের মধ্যে মিত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল আইজেনহাওয়ার, যিনি পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, জাপান আসলে ততক্ষণে পুরোপুরি হেরে গিয়েছিল, তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল, তাই তখন বোমা নিক্ষেপের সিদ্ধান্ত আদতে পুরোপুরি প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছিল। যুদ্ধ পরবর্তী ১,০০০ জনের একটি প্যানেল গঠিত হয়, যেখানে বেঁচে যাওয়া জাপানী নেতৃবৃন্দও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা এক রিপোর্টে বলছেন, যুদ্ধের কারণে দেশের অবস্থা এমন হয়েছিল যে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ না করলেও জাপান এমনিতেই আত্মসমর্পণ করতো। তাই আত্মসমর্পণের পেছনে উক্ত বোমা হামলা ঠিক ততটা গুরুত্ব বহন করে না।

অর্থাৎ এই গুরুত্বহীন হামলায় সেদিন হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক মারা গিয়েছিল। হিরোশিমায় ফেলা ৪,৪০০ কেজি ভরের ‘লিটল বয়’ নামক বোমাটি ১৫ কিলোটন টিএনটির সমতুল্য। সেদিনের আক্রমণে প্রায় ২০,০০০ এর মতো সেনা এবং ৭০,০০০ থেকে ১,২৬,০০০ এর মতো সাধারণ মানুষ বিস্ফোরণজনিত আঘাত ও বিকিরণে মারা যায়। কমপক্ষে ৩৯,০০০ মানুষ মুহূর্তেই নিহত হয়, যাদের মধ্যে ছিল অগণিত নারী ও শিশু। মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যেই যেন ক্ষতবিক্ষত, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

নাগাসাকিতে ফেলা পারমাণবিক বোমাটির নাম ছিলো ‘ফ্যাট ম্যান’। এর বিধ্বংসী ক্ষমতা ছিলো লিটল বয়ের থেকেও বেশি। ৪,৬৭০ কেজি ভরের ফ্যাট ম্যানের ধ্বংসক্ষমতা ছিলো ২১ কিলোটন টিএনটির সমতুল্য। তবে নাগাসাকির পাহাড়ি-প্রকৃতি সেখানকার জনগণকে বোমার আঘাত থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বিধ্বংসী ক্ষমতা বেশি হলেও ফ্যাট ম্যানের আঘাতে মারা যায় ৩৯,০০০ থেকে ৮০,০০০ এর মতো মানুষ, যদিও এ সংখ্যাটাও কোনো অংশেই কম নয়।

ম্যানহ্যাটান প্রজেক্ট, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি-এর সূত্রমতে, দুটো বোমায় প্রায় ৬০,০০০ এর মতো মানুষ বোমা ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যুবরণ করে। বিস্ফোরণ পরবর্তী উদ্ধারকাজের সাথে জড়িতদের প্রায় সবাই বলেছেন, তারা পোড়া কাগজের স্তূপের ন্যায় দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া মৃতদেহ দেখেছেন। অনেকে জানতেনই না যে তারা আসলে মৃত মানুষের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ লাশের কোনো বৈশিষ্ট্যই সেখানে অবশিষ্ট ছিল না। বোমা দুটোর একদম কেন্দ্রস্থলে যারা ছিল তাদের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেননা সেগুলো প্রচন্ড উত্তাপে স্রেফ বাষ্প হয়ে গিয়েছিল। যারা সাথে সাথে মারা গেছে তারা তুলনামূলক ভাগ্যবান। কেননা পরবর্তীতে অসংখ্য মানুষ আঘাত ও বিকিরণজনিত কারণে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেছেন।

এমন ভয়াবহ হামলার পরেও অনুশোচনার লেশমাত্র ছিলো না ট্রুম্যানের কণ্ঠে। উল্টো জাপান যদি আত্মসমর্পণ না করে তাহলে এর সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে তিনি হুমকি দিয়ে জানান, “A rain of ruin from the air, the like of which has never been seen on this earth.”

শতাব্দীর ভয়াবহতম যুদ্ধ শেষ হবার পর বারাক ওবামাই ছিলেন প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি যুদ্ধ পরবর্তীকালীন জাপান সফর করেন। তবে তিনি যে পারমাণবিক বোমা হামলার জন্য ক্ষমা চাইতে পারে এমন আশা কেউ কেউ করছিলেন। আর তাদের এই আশা যে বোকামো ছিল তা তো পুরো বিশ্বই জানে।

ভবিষ্যতে যেন পারমাণবিক বোমার ব্যবহার না হয় এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা। কেননা বর্তমানে পরাশক্তিগুলোর হাতে যে পরিমাণ নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড আছে, তা দিয়ে পুরো পৃথিবী কয়েকবার ধ্বংস করা যাবে। তাই পরমাণু শক্তির একমাত্র শান্তিপূর্ণ ব্যবহারই আমাদের কাম্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here