রাজকীয় প্রাণী এম্পেরর টামারিন (Emperor Tamarin) এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘Saguinus Imperator’। Tamarin প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত অনন্য সুন্দর এ প্রাণীটির নামকরণ করা হয় জার্মানির সম্রাট Wilhelm 2 এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে। আমাজন বেসিনের দক্ষিণ-পশ্চিমে, পেরুর পূর্বে, বলিভিয়ার উত্তরে ও পশ্চিম ব্রাজিলের অ্যাকরে এবং আমাজোনাসে এরা বসবাস করে।

এম্পেরর টামারিন কর্ডাটা পর্বের স্তন্যপায়ী শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এমপেরর টামারিনের লোম প্রধানত ধূসর রঙের। বুকের দিকে থাকে ছোট ছোট হলদে দাগ। এর হাত-পা কালো এবং লেজ বাদামি। রয়েছে অসাধারণ একজোড়া সাদা গোঁফ যা তার কাঁধ ছাড়িয়ে দু’দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণীটি ৯-১০ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। সাথে থাকে ১৩.৮- ১৬.৩ ইঞ্চি বিশিষ্ট লম্বা লেজ। এর প্রায় ৫০০ গ্রামের কাছাকাছি ওজন হয়। গড় আয়ুষ্কাল ১০-২০ বছর।

এম্পেরর টামারিনের দুটো উপপ্রজাতি রয়েছে, ‘Saguinus Imperator Imperator’ ও ‘Saguinus Imperator Subgrisescens’। Saguinus Imperator Imperator মূলতঃ Black-chinned Emperor Tamarin নামে সুপরিচিত। এদের দু’জনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো, Saguinus Imperator Subgrisescens এর লম্বা সাদা দাড়ি রয়েছে, যার ফলে একে Bearded Emperor Tamarin বলা হয়।

ব্লাক চিনড এম্পেরর টামারিন : এর প্রতিটি আঙ্গুলে নখর রয়েছে। এর সাদা গোঁফ থাকলেও থুতনিতে কোনো সাদা লোম দেখা যায় না। Saguinus Imperator এর কালো থুতনি দৃশ্যমান। পেট এবং বুকের দিকে লাল, কমলা ও সাদায় মেশানো লোম থাকে এবং পিঠের দিকে থাকে কালচে বাদামি লোম। হাত-পায়ের ভেতরের দিকের লোম হয় অনেকটা কমলা রঙের।

বেয়ার্ড এম্পেরর টামারিন : Saguinus Imperator Subgrisescens শারীরিক গঠনের দিক থেকে Black-chinned Emperor Tamarin এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যাই হোক, পার্থক্য মূলতঃ এদের বুক, পেট ও হাতের লোমের রঙে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, বড় বড় সাদা গোঁফের পাশাপাশি এদের সাদা লোমশ দাড়িও আছে।

দাড়ি আর রঙের পার্থক্য বাদ দিলে এদের শারীরিক গঠন একই। অন্যান্য প্রাইমেটদের তুলনায় এরা আকৃতিতে খুব ছোট। নখের সাহায্যে গাছের শাখায় চড়ে এরা সারা জঙ্গল দাপিয়ে বেড়ায়। চিরহরিৎ বনগুলোতে এদের গাছ থেকে গাছে দাপিয়ে বেড়ানো খুব চোখে পড়ে। মাটিতে এদের পা পড়ে না বললেই চলে।

আমাজনের নিচু ভূমি ও চিরহরিৎ বনভূমির নিচু পর্বত গুলোতে এদেরকে বেশি দেখা যায়। আমাজনের নিচু ভূমিগুলোতে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতার জন্য জলের প্রাচুর্যতা রয়েছে, এজন্য কাছাকাছি জলের উৎসগুলো সবসময় প্লাবিত থাকে। সারা বছর জুড়েই এখানে স্যাঁতসেঁতে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু বিরাজ করে। এই নিচু পার্বত্য বনগুলোতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আদ্র জলবায়ুর কারণে খাদ্যের প্রাচুর্যতা থাকায় Emperor Tamarin এই অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। শুষ্ক মৌসুমে প্রচুর ফুল ফুটলেও শীতকালে কমে যায়, যা বানরদের খাদ্যের উপরে প্রভাব ফেলে।

এম্পেরর টামারিন ১৬-২০ মাস বয়সে সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম হয়। মায়ের গর্ভকালীন সময় থাকে ৬ মাস। এরা মৌসুম ভেদে প্রজনন করে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্ভর করে চারপাশের খাদ্যের পর্যাপ্ততার ওপর। শীতকালে যখন খাদ্যের উৎসের প্রাচুর্যতা থাকে বেশিরভাগ শিশুর জন্ম তখনই হয়ে থাকে। সাধারণত এরা একসঙ্গে দুটো বাচ্চার জন্ম দেয় তবে একটি অথবা একেবারে তিনটি বাচ্চাও হয়।

একসময় ভাবা হতো টামারিন শুধু মাত্র একজন সঙ্গীর সাথে মিলিত হয়। কিন্তু পর্যবক্ষেণের পর দেখা যায় এরা আসলে মিলনঋতুতে বহুভর্তৃক হয়ে থাকে। একটি প্রভাবশালী স্ত্রী টামারিন একাধিক পুরুষের সাথে সঙ্গম করে। এই সঙ্গম পদ্ধতিই বাবা-মায়ের সন্তানদের উপর দায়িত্ব নিশ্চিত করে। যদি একটি স্ত্রী একাধিক পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে একাধিক বাচ্চা জন্ম দেয়, তবে সেই সব পুরুষেরা বাচ্চা লালন-পালনে অংশগ্রহণ করে। কারণ এদের যেকোনো একটি বাচ্চা তার ঔরসজাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। জমজ বা একাধিক শিশু জন্মের হার বেশি হওয়ায় সন্তান লালন-পালনে বাবা-মায়ের সময় দেয়াটা বাচ্চাটির টিকে থাকার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এম্পেরর টামারিন বন্য পরিবেশে কর্মঠ, ক্ষিপ্রবেগ সম্পন্ন, সুশ্রী, দলবদ্ধ ও খেলুড়ে স্বভাবের হয়ে থাকে। বন্দি অবস্থায় এরা খুব সামাজিক ও মানুষের সাথে খুব মিশুক প্রকৃতির দেখা যায়। গাছের উপরে যৌথ পরিবারের মতো এরা দল বেঁধে বসবাস করে। একেকটি দলে ১৫ বা তার বেশি সদস্যও থাকে। এম্পেরর টামারিন নিশাচর প্রাণী নয়, তাই রাতে ঘুমায় এবং সারাদিন জেগে থাকে।

এম্পেরর টামারিন ফল, পোকামাকড় ও গাছের রস খেয়ে জীবনধারণ করে। অন্যান্য বড় বানর যেখানে পৌঁছাতে পারে না, আকৃতি ছোট হওয়ায় এরা সহজেই সেখানে পৌঁছে যায়।

বাসস্থানের সংকট এম্পেরর টামারিনের জন্য প্রধান ঝুঁকি। চাষাবাদ, কাঠ সংগ্রহ, পশু-পালন এবং রাস্তাঘাট এদের আবাসস্থলগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। পোষা প্রাণীর ব্যবসায়ীদের শিকারে পরিণত হওয়া এম্পেরর টামারিনের জন্য নতুন একটি হুমকি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here