আমেরিকার লস-অ্যাঞ্জেলসের জিরো পয়েন্ট থেকে ৭ মাইল পশ্চিমে লা-ব্রিয়া আলকাতরা কূপ থেকে আলকাতরা সংগ্রহ করে সেই প্রাচীনকাল থেকেই আমেরিকার আদি বাসিরা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে আসছে। ইউরোপিয়ানরা আমেরিকা আবিষ্কারের পর সেখানে খননকাজ শুরু হয়। তখন থেকেই বিভিন্ন রকম হাড়গোড় পাওয়া গেলেও ভাবা হতো, এগুলো দুর্ভাগা কিছু গবাদি পশুর হাড়গোড় ছাড়া আর কিছুই না।

প্রাণীদের জন্য আলকাতরার কূপ খুবই ভয়ঙ্কর জায়গা। গাছের পাতা আবৃত হয়ে অনেক সময়ই আলকাতরায় আচ্ছাদিত ভূমিকে সাধারণ ভূমির মতোই মনে হয়। উপরন্তু, কোন প্রাণী আটকে গেলে সহজ শিকারের লোভে দলে দলে শিকারি প্রাণীরা আলকাতরায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে শিকার এবং শিকারী উভয়েরই করুন মৃত্যু ঘটে। মজার ব্যাপার হলো, আলকাতরা অনেক ভাল সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করে। হাড়গোড় তো বটেই, অনেকক্ষেত্রে মাংশ পর্যন্ত আলকাতরায় হাজার হাজার বছর সংরক্ষিত থাকে। ফলে, আলকাতরার কূপ থেকে যে ফসিল গুলো পাওয়া যায় সেগুলো থাকে অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থায়।

১৯৯১ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জন সি. মেরিয়াম [John C. Merriam] এবং তার কিছু ছাত্র মিলে এই কূপের উপর গবেষণা শুরু করেন। একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে ৪০ হাজার বছর থেকে ৮ হাজার বছর আগে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া দাপিয়ে বেড়ানো দানবদের জীবন-তত্ত্ব। ৫৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৩৫ প্রজাতির পাখিসহ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে প্রায় ৬৬০ প্রজাতির প্রাণীর ফসিল যা এই পিটের পাশেই গড়ে ওঠা জর্জ সি পেজ মিউসিয়াম অব লা ব্রিয়া ডিসকভারিস -এ রাখা হয়েছে।

প্রাপ্ত ফসিলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময় জাগানো প্রাণীটিই হলো দাঁতালো বাঘ [Sabertooth Tiger]। সাধারণভাবে এদেরকে বাঘ বললেও এরা মোটেও বাঘ নয়। এটা বৃহৎ বিড়াল পরিবারের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সদস্য। বাঘ, সিংহ, চিতা, জাগুয়ার, পোষা বিড়াল, ববক্যাট ইত্যাদি মূলতঃ প্রাণীজগতের একই পরিবারের সদস্য।

শারীরিক গঠন
লস-অ্যাঞ্জেলসের এই পিট থেকে এখনো পর্যন্ত কয়েক হাজার দাঁতালো বাঘের হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়েছে। ফলে, তাদের শারীরিক গঠন এবং তাদের জীবন ধারণ পদ্ধতি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেছে। এরা উচ্চতায় আফ্রিকান সিংহের চেয়ে ১ ফুট কম হলেও ওজনে ছিল দ্বিগুণ। পুরো দেহ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী মাংসপেশিতে পরিপূর্ণ। বর্তমান বাঘ, সিংহ এবং চিতার লম্বা লেজ আছে, যা তাদের দ্রুতগতিতে দৌড়ানোর সময় ভারসাম্য রক্ষা করতে কাজে লাগে। কিন্তু, এদের লেজ ছিল খর্বাকৃতির। উপরন্তু, এদের সামনের পায়ের চেয়ে পিছনের পা ছিল অনেকটাই ছোট, অনেকটা হায়েনার মতো। এধনের শারীরিক গঠন মোটেও জোড়ে দৌড়ানোর উপযোগী নয়। যা থেকে প্রমাণিত হয়, এরা ছিল গুপ্ত শিকারি। সম্ভবত, এরা ঝোপ-ঝাঁরে ওঁত পেতে থাকত আর শিকার কাছে আশা মাত্র আচমকা আক্রমণ করে বসত।

এদের শারীরিক গঠনের যে ব্যাপারটি সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তা হলো এদের ছুরির মতো লম্বা বাঁকানো দুটি দাঁত যা উপড়ের চোয়ালের সামনের দিক থেকে বের হয়ে নিচের দিকে প্রলম্বিত। প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, এরা যেহেতু, বড় বড় তৃণভোজী প্রাণীদের শিকার করে বেড়াতো, এই বিশালাকৃতির দাঁত দুটি হয়তো শিকারকে টেনে ধরে রাখার কাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু, পরবর্তীতে জানা গেল, এগুলো বাঘ-সিংহের ক্যানাইন দাঁতের মতো অতটা দৃঢ় নয় যে বড় কোন শিকারকে ধরে রাখা যাবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ফসিল থেকে পূর্ণ বয়স্ক দাঁতালো বাঘের যেসব কঙ্কাল পাওয়া যায়, তাদের কোনটিরই তেমন দাঁত ভাঙ্গা অবস্থায় নেই। ফলে, এরা কিভাবে শিকার করতো তা অনেকদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যই ছিল।

আপনি জেনে অবাক হবেন যে, এই দাঁত দুটির ভিতরের দিকটা ছিল অনেকটাই ছুরির মতো ধারালো এবং সরাসরি কামড় বসিয়ে আক্রমণ করার বদলে এরা দাঁত গুলো কৌশলগত ভাবে ব্যবহার করতো। প্রথমে, ঝোপঝাড় থেকে আচমকা বের হয়েই থাবার সাহায্যে শিকারকে মাটিতে ফেলে দিত। এদের থাবা গুলো বর্তমান বাঘ সিংহের চেয়ে অনেক বেশি প্রলম্বিত এবং শক্তিশালী হওয়ায় এদের কাছে অনেক বড় বড় শিকারকেও এভাবে ফেলে দেয়া ছিল মামুলি ব্যাপার। এরপর লম্বা দাঁত গুলোর দ্বারা গলার মূল রক্তনালী গুলো কেটে দিত।
শিকারের এই কৌশল বর্তমান বিড়াল পরিবারের কোন প্রজাতির মধ্যেই দেখা যায় না। বাঘ সিংহসহ অন্যান্য বিড়াল প্রজাতির প্রাণীরা মূলতঃ শিকারকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

বিস্তৃতি

ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলসে যে দাঁতালো বাঘের ফসিল পাওয়া গেছে সেটি স্মাইলোডন বে পরিচিত। স্মাইলোডন অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক দাঁতালো বাঘ। যা প্রায় ১১ হাজার বছর আগে পর্যন্ত বিচরণ করতো। এদের তিনটি প্রজাতি চার কোটি বছর ধরে সমগ্র আমেরিকা মহাদেশ প্রায় দাপিয়ে বেড়িয়েছে, যথাক্রমে S. Gracilis, S. Fatalis এবং S. Populator ( বৈজ্ঞানিক নাম)। এরা দলগতভাবে বসবাস করতো নাকি বর্তমান বাঘের মতো একাকী শিকারি ছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্কের অবসান এখনো হয়নি। তবে, সাম্প্রতিক গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, এরা মারাত্মক আহত অবস্থায় অনেকদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকত যা দলগত ভাবে বসবাস করার প্রমাণ বহন করে। মারাত্মক আহত অবস্থায় কোন শিকারি প্রাণীর পক্ষেই শিকার করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এরকম অবস্থায় কোন সঙ্গী খাবার সংগ্রহ না করলে বেচে থাকা অসম্ভব।

এদের বিলুপ্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ৩ টি মতবাদ প্রচলিত আছে। প্রথমটি এরকম: বরফ যুগের শেষের দিকে সাইবেরিয়া থেকে যাযাবর শিকারিরা আলাস্কা হয়ে অনেকেই বর্তমান আমেরিকার বিভিন্ন জঙ্গলে বসতি গড়ে তোলে। মানুষ খাবারের জন্য বিভিন্ন তৃণভোজী প্রাণী শিকার করা শুরু করলে দাঁতালো বাঘেরা খাদ্যাভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

দ্বিতীয় মতবাদ: প্রায় ১০ হাজার বছর আগে সর্বশেষ বরফ যুগ শেষ হবার সাথে সাথে এদের বিচরণ ভূমির অনেক পরিবর্তন আসে। তৃণভূমির জায়গা দখল করে নেয় বড় বড় গাছাপালা। বিলুপ্ত হয়ে যায় সব বৃহৎ তৃণভোজী প্রাণীরা। সাথে খাদ্যাভাবে বিলুপ্ত হয় মাংসাশী প্রাণীরাও।

তৃতীয় মতবাদ: বরফ যুগের শেষের দিকে বর্তমান বিড়াল প্রজাতির প্রাণী যেমন সিংহ, জাগুয়ার, চিতা ইত্যাদি দ্রুতগামী প্রাণীদের সাথে দাঁতালো বাঘের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। পূর্বের ধীরগতির তৃণভোজী প্রাণীরা বিলুপ্ত হয়ে, বর্তমান দ্রুতগতির হরিণ জাতীয় প্রাণীর উদ্ভব ঘটে।ফলে, দাঁতালো বাঘেরা টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় হেরে যায়।

তবে, এমনও হতে পারে, এই ৩টি কারণের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়াতেই এই রাজকীয় প্রাণীটি পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে উধাও হয়ে যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান বিড়াল জাতীয় প্রাণীরা দাঁতালো বাঘের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগতির আর ক্ষিপ্র। বর্তমান বন্য পরিবেশে শিকারের সিংহভাগ ক্ষেত্রে শিকারকে গতিতে হার মানাতে হয়। সেদিক থেকে বিচার করলে, দাঁতালো বাঘ হয়তো বর্তমান শিকারিদের কাছে ম্রিয়মাণ। তবে, বরফ যুগে বসবাস করা ধীর গতির বিশালদেহী সব মহিষ, বাইসন, এমনকি হাতি পর্যন্ত শিকারে দাঁতালো বাঘের কোন জুড়ি নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here