অধ্যাপক জ্যাঙ্কার এবং একটি জীবিত মৃতদেহের রহস্য

এই ঐতিহাসিক বিরল ঘটনাটি ফ্রিডরিখ ক্রিশ্চান জ্যাঙ্কার নামে জার্মানির হ্যেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের এক প্রফেসরকে ঘিরে। তিনি সম্মানিত চিকিত্সক এবং রসায়নবিদ জোহান জ্যাঙ্কারের পুত্র, যিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও ছিলেন এবং এক পর্যায়ে ঐতিহাসিক ফ্রান্সক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ছিলেন, যা ছিল বঞ্চিত, নিঃস্ব ও অনাথ বাচ্চাদের জন্য স্কুল এবং দরিদ্রদের জন্য চিকিত্সা যত্ন সেবা প্রদানের জন্য। তিনি ক্লিনিকাল চিকিত্সা প্রশিক্ষণের  আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবিত কেন্দ্র হিসাবে মানচিত্রে হ্যেলকে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাই ফ্রিড্রিচের কিছু বড় অবদান ছিল, তবে তিনি একজন ভাল অধ্যাপক এবং চিকিত্সক হিসাবে নিজের নাম রেখে গেছেন। তবে তিনি মৃতদেহের সাথে তার পাগলামির যে অভিজ্ঞতা রেখে গেছেন তা কখনো ভোলার নয়।

এটি এমন একটি যুগ ছিল যেখানে গুরুতর ডাকাতরা এবং দেহ ছিনতাইকারীরা নতুনভাবে খনন করা লাশগুলি মেডিকেল সংস্থাগুলিতে বিক্রি করত এবং কিছু অধ্যাপকরা নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য নিজেরাই লাশ খননের উদ্যোগ নিতেন, তবুও জঙ্কার এই ধরনের অনুশীলনকে অগ্রহণযোগ্য এবং বিরক্তিকর বলে মনে করেতেন, তাই তিনি এমন কিছু করেছিলেন যা তার কাছে আরও সম্মানজনক ছিল। তিনি সদ্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের মৃতদেহ ব্যবহার করেছিলেন। এই মৃতদেহগুলি পেতে অধ্যাপকের নিজস্ব লোকবল ছিল এবং মনে হয় না যে এই তাঁর  লোকবল দেহগুলি পেতে কী করেছে সে সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি অবগত ছিলেন। তারা কেবল এই মৃত অপরাধীদের লাশের সাথে হাজির হতো এবং কোনো প্রশ্ন না করে জ্যাঙ্কার সেগুলা গ্রহণ করতো।

এক সন্ধ্যায় জ্যাঙ্কার সেইরকমই একটি ডেলিভারি পেলেন, যেখানে একটি নয়, সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের দুটি নতুন লাশ তার নিজের দরজার সামনে ডেলিভারি পেয়েছিলেন। প্রফেসর তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সেগুলি সংরক্ষন কক্ষে রাখতে পারেন নি কেননা সেই সময়ে তাঁর কাছে চাবি ছিল না। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মৃতদেহগুলি তার কক্ষে রাখতে এবং পরবর্তী সকালে তাদের সরিয়ে ফেলতে। মৃতদেহ দুটিকে প্রবেশকক্ষের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। জ্যাঙ্কার তাদেরকে তাদের কাজে পাঠিয়ে দেয় এবং তার পড়ার ঘরে ফিরে যান এবং রাতে তার পরিবারের সবাই ঘুমাতে যায়, যদিও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দু’জন ফাঁসীর অপরাধীর মৃত লাশ পড়ার ঘরে ফেলে দেওয়ার বিষয়ে তার পরিবার কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল তা স্পষ্ট নয়। যাইহোক এটি তাদের জন্য কোনো বিশেষ উদ্বেগের কারন ছিল না বরং রাতটি তাদের জন্য কিছুটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে চলেছিল।

প্রায় মধ্যরাতের দিকে, একটি অদ্ভুদ শব্দের দ্বারা জ্যাঙ্কারের মনযোগ ভেঙে যায়।  এটি প্রায় একটি দোলাচল এবং হ্যাচরানো শব্দের মতো শোনা যাচ্ছিল এবং একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে এটি কী ছিল তা বোঝার জন্য তিনি ঘরের চারিদিকে ঘুরে দেখতে লাগলেন, তখনই তিনি লক্ষ্য করলেন যে এটি সেই কক্ষ থেকে অর্থাৎ অস্থায়ী মর্গ থেকে আসছিলো বলে মনে হচ্ছিলো। প্রথমে, তিনি ভেবেছিলেন যে তার বিড়ালটি মৃতদেহগুলির সাথে সেখানে আটকা পড়ে গেছে এবং তাই তিনি ভিতরে ঢুকে একবার দেখার জন্য দরজাটি খুললেন। রুমটি পরীক্ষা করতে করতে তিনি মোমবাতির নৃত্যীয়মান আলোতে দেখতে পেলেন যে, মৃতদেহগুলি ধারণ করেছিল যে বস্তা সেগুলির মধ্যে একটি ছিঁড়ে পড়েছিল এবং মৃতদেহটি সেখানে ছিল না, অন্য দেহটি তখনও সেখানে সেই ভাবে পড়ে ছিল। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন যে কেউ মনে হয় এটি চুরি করেছে এবং তাই তিনি বাড়ির আশেপাশে খুজে  দেখছিলেন। তবে তিনি কোনো চোর অথবা জোরপূর্বক অনুপ্রবেশকারীকে খুজে পাননি বরং সকল দরজা ও জানালা তালাবদ্ধ অবস্থায় পান। তারপরে সে বিহ্বল অবাস্থায় সেই অন্ধকার ঘরে ফিরে যান এবং সেই ফাঁকা বস্তাটার দিকে তাকাতেই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পায় ঘরের কোণার দিক দিয়ে, তখনই তাঁর দৃষ্টি চলে যায় ঘরের কোণার দিকে যেখানে সে একটি ছায়ামূর্তি দেখতে পায়। এবার যখন তিনি মোমবাতিটি উত্থাপন করলেন, তখন লাফানো শিখাতে দেখলো যে নিখোঁজ লাশটি ঘরের কোনে একটি চেয়ারে এমনভাবে বসে আছে যেনো এটি পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণতম ঘটনা।

লোকটি খুব স্পষ্টতই মারা যায় নি এবং তার গলা পরিষ্কার করার পরে সে  জ্যাঙ্কারকে বলেছিল যে, শেষ কথাটি তার মনে পড়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিল এবং তার পরের যে জিনিসটি সে মনে করতে পারে তা হল সে একটি বস্তার মধ্যে সেই অন্ধকার ঘরে জেগেছিল। তিনি জ্যাঙ্কারকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তিনি তাকে আবার আটককারীদের হাতে ফিরিয়ে না দেয়, কারণ তার বন্দীরা অবশ্যই তাকে আবার ফাসিতে ঝুলিয়ে দেবে, এবং সে হতবাক চিকিত্সককে তাকে লুকিয়ে রাখতে এবং পালাতে সহায়তা করতে অনুরোধ করেছিল। মোমবাতির আলোতে ফ্যাকাসে মুখের একটি মৃত ব্যক্তিকে বসে থাকতে দেখা এবং তার সাথে কথা বলা জ্যাঙ্কারের পক্ষে যথেষ্ট ভয়ের ছিল এবং সে পিছু হটে পালানোর চেষ্টা করলো এবং তারপরে তার সাথে যা ঘটেছিল তা একটু জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল ঠিক এভাবেই :

প্রফেসর তখন এক পা এক পা করে পিছু হটতে লাগল এবং তার চোখ তখনও সেই লোকটির দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে আছে এবং মোমবাতিটি তার হতে ধরে ছিল দরজায় পৌঁছানো পর্যন্ত। মৃত ব্যক্তিটি তাত্ক্ষণিকভাবে উঠে দাড়িয়েছিল এবং তাকে অনুসরণ করছিল। লাশটির বিব্রত চেহারা, নগ্নতা এবং গতিবেগের একটি চিত্র, একই সাথে সেই সময়ের দীর্ঘতা, গভীর নীরবতা সবকিছুই তাকে বিভ্রান্তিতে পাগল করে তোলে। তখনই তিনি তার একমাত্র মোমবাতি যেটি জ্বলছিল তা হাত থেকে ফেলে দেয় এবং সমস্ত কিছু অন্ধকারে ছেয়ে যায়। তিনি কোনোভাবে তার  অ্যাপার্টমেন্টে পালিয়ে গেলেন এবং নিজেকে বিছানায় ফেলে দিলেন; কিন্ত সেখানেও তাকে লাশটি অনুসরণ করেছিল এবং শীঘ্রই তিনি অনুভব করলেন যেন মৃত ব্যক্তিটি তার পায়ে আলিঙ্গন করে আছে এবং জোরে জোরে কাঁদছে, “আমাকে ছেড়ে দিন, আমাকে ছেড়ে দিন” জ্যাঙ্কারকে মৃতব্যক্তিটি তার হাত থেকে ছেড়ে দেয় , তখন সে চিৎকার করে বলতে থাকে, “আহ! ভাল জল্লাদ, ভাল জল্লাদ আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি যদি কাউকে ফোন করে আমার ব্যপারে বলে দেন তাহলে তাঁরা আমাকে আবারও ফাঁসিতে ঝুলাবে। মানবতার জন্য হলেও আমার জীবন রক্ষা করুন।

মৃত ব্যক্তিটি তাকে বলেছিল যে সে একজন পলাতক মিলিটারী আসামী তাই তার উপর তাঁরা কোনো রকম দয়া দেখাবে না। জ্যাঙ্কার তখন দেখতে পেল যে লোকটি আসল প্রেত নয়, তার কোনও ক্ষতিও করবে না, যদিও বন্য চোখের ছিল কিন্ত সত্যিকার অর্থে তাকে আবার ফাঁসি দেওয়া হবে বলে সে ভয় পেয়েছিল। তিনি এই অসহায় লোকটির প্রতি করুণা প্রকাশ করেছিলেন এবং তাকে পালাতে সহায়তা করতে সম্মত হন, তবে কীভাবে তা করবেন তা নিশ্চিত ছিলেন না। লোকটিকে অন্য এক অঞ্চলে পালাতে সহায়তা করার জন্য, তাকে কেবল রাতের অন্ধকারে লোকচক্ষুর অগোচরেই নয় বরং শহরের প্রধান ফটকগুলির প্রহরীদেরও পার করে  যেতে হতো। জ্যাঙ্কার লোকটিকে তার নিজের পোশাক পরিয়ে তার উপর একটি চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল এবং তাকে তার একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী হিসাবে পার করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। আশ্চর্যরূপে তারা প্রহরীদের সহজেই পার করতে পেরেছিল যখন জ্যাঙ্কার তাদের জানায় যে একজন লোক শহরের উপকণ্ঠে মারা যাচ্ছে এবং তাকে ও তার সহকর্মীকে জরুরিভাবে তাড়াতাড়ি করে তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। তারা শহরের গেটগুলি পার করার সাথে সাথে মৃত ব্যক্তিটি জ্যাঙ্কারের প্রতি তার চির কৃতজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং রাতের আধারে হারিয়ে যায়। এবং এটিই হতে পারতো এই উদ্ভটগল্পের সমাপ্তি, “জ্যাঙ্কার এবং “জীবিত মৃতদেহ, কিন্তু তা আবারো নতুন মোড় নিল ১২ বছর পরে, যখন জঙ্কার আমস্টারডামে বেড়াতে গিয়েছিল। অদ্ভুত ঘটনাগুলির বাকি অংশ নেওয়া হয়েছে প্রফেশনাল অ্যানাডোটস এর ১৮২৫, প.১৯৪-১৯৫-

বারো বছর পরে, আমস্টারডামে যাওয়ার জন্য জ্যাঙ্কারের একটি উপলক্ষ ছিল। সেখানে একজন ভাল পোশাক পরিহিত লোক তাকে অভিবাদন জানিয়েছিল এবং প্রথম উপস্থিতিতে যার সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়েছির যে সে সেই শহরের অন্যতম সম্মানিত একজন ধনী বণিক ছিলেন। বণিক তাকে বিনয়ের সুরে জিজ্ঞাসা করলেন যে তিনি হ্যালের অধ্যাপক জ্যাঙ্কার কিনা? এবং একটি ইতিবাচক জবাব  পেয়ে তিনি আন্তরিকভাবে তাকে অনুরোধ করলেন রাতে তাঁর সাথে খাবার খাওয়ার জন্য। অধ্যাপক সম্মতি জানালেন। রাতে বণিকের বাড়িতে পৌঁছে তিনি দেখলেন একটি মার্জিত অ্যাপার্টমেন্ট, যেখানে ছিল একটি সুন্দর স্ত্রী এবং দুটি সুন্দর স্বাস্থ্যবান সন্তান। তবে তিনি এমন কোনও পরিবারের পক্ষ থেকে এতটা মৈত্রী অভ্যর্থনা পেয়ে তাঁর আশ্চর্যতা খুব কমই দমন করতে পারেন, বরং যেখানে তিনি মনে করেছিলেন যে সেই পরিবারে তিনি পুরোপুরি অপরিচিত একজন ব্যক্তি।

রাতের খাবার শেষে, বণিক তাকে তার গণনা কক্ষে নিয়ে বললেন, “আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না?” – একদমই না- জবাব দিলেন তিনি। উত্তরে বণিক  বললো আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি- কিন্ত আমার অতীত দ্বারা আপনি  কখনই প্রভাবিত হবেন না, কেননা আপনিই আমার দ্বিতীয় জীবন দানকারী।  “আমিই সেই ব্যক্তি যিনি একদা একসময় আপনার ঘরের মধ্যে এসেছিলাম এবং যার প্রতি আপনিও এতটা মনোযোগ দিয়েছিলেন। আপনার কাছ থেকে বিদায়  নেওয়ার পরে আমি হল্যান্ডের চলে এসেছিলাম। আমার হাতের লেখা ভাল ছিল;  হিসাব-নিকাষেও ভাল দক্ষতা ছিল; আমার রূপশৈলীও কিছুটা আকর্ষণীয় ছিল এবং আমি শীঘ্রই এক বণিকের কেরানি হিসাবে কর্মসংস্থান পেয়েছিলাম। আমার উত্তম আচরণ এবং আমার পৃষ্ঠপোষকের স্বার্থের প্রতি আমার উত্সাহ, আমাকে আমার মালিকের আত্মবিশ্বাস এবং তাঁর মেয়ের ভালবাসা অর্জন করতে সাহায্য করেছিল। তিনি ব্যবসা থেকে অবসর নেওয়ার সময় আমি তাকে এতটাই সফল করেছিলাম যে তিনি আমাকে তার জামাই করে নিয়েছিলেন। তবে আপনি না থাকে এই সমস্ত উপভোগ করার জন্য আজ আমি বেঁচে থাকতাম না। এখন থেকে আমার বাড়ি, আমার ভাগ্য এবং স্বয়ং আমি, সব কিছুই আপনার করূণার প্রতিদান এবং সবকিছু আপনার জন্য উৎস্বর্গ করলাম।

এটি অবশ্যই একটি দুর্দান্ত, অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর ছোট্ট গল্প। যদিও রহস্যময় “মৃত মানুষ” সত্যিকারের আসল জীবন্ত লাশ নাও হতে পারে, তবুও সে বেঁচে গিয়েছিল তাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর পরও। অতঃপর একজন চিকিত্সকের বাড়িতে আশ্রয় পায় এবং অবশেষে তার সহায়তায় পালিয়ে যেতে সফল হয় এবং জীবনে অনেক বড় সফল বণিক হয়। অবশেষে একটি বিষয় অবশ্যই নিশ্চিত যে আপনি যদি কখনও আপানার কক্ষে বসে কোনও মৃত ব্যক্তিকে আপনার সাথে কথা বলতে দেখেন তবে তাদের সাহায্য করা একটা ভাল সিদ্ধান্তও হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here